মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

 

রাজা  টংকনাথের  রাজবাড়িঃ

রাণীশংকৈল  উপজেলার  বাচোর  ইউনিয়নে  কুলিক  নদীর তীরে  মালদুয়ার জমিদার রাজা  টংক নাথের  রাজবাড়ি।  টংক  নাথের  পিতার  নাম বুদ্ধিনাথ চৌধূরী। বুদ্ধিনাথ  চৌধূরী  ছিলেন মৈথিলি ব্রাক্ষণ  এবং  কাতিহারে  ঘোষ  বাগোয়ালা বংশীয়  জমিদারের  শ্যামরাই  মন্দিরের  সেবায়েত।  নিঃসন্তান  বৃদ্ধগোয়ালা  জমিদার  কাশিবাসে  যাওয়ার  সময়  সমস্ত  জমিদারি  সেবায়েতের  তত্ত্বাবধানে  রেখে  যান  এবং  তাম্রপাতে  দলিল  করে  যান  যে,  তিনি  কাশি  থেকে  ফিরে  না  এলে  শ্যামরাই  মন্দিরের  সেবায়েত  এই  জমিদারির  মালিক   হবেন।  পরে  বৃদ্ধ  জমিদার  ফিরে না আসার  কারণে  বুদ্ধিনাথ  চৌধুরী  জমিদারী  পেয়ে  যান।  তবে  অনেকে  মনে  করেন  এই  ঘটনা  বুদ্ধিনাথ  চৌধুরীর   দু-এক  পুরুষ  পূর্বেরও  হতে  পারে।  রাজবাড়ি  নির্মাণের  কাজ বুদ্ধিনাথ  চৌধূরী  শুরু  করেলও  সমাপ্ত  করেন  রাজা টংকনাথ।  বৃটিশ  সরকারের  কাছে  টংকনাথ  রাজা  উপাধী  পান।  উনবিংশ  শতাব্দীর  শেষভাগে  রাজ  বাড়িটি  নির্মিত  হয়।  রাজবাড়ির  পশ্চিম  দিকে  সিংহ  দরজা।  রাজবাড়ি  সংলগ্ন  উত্তর  পুর্ব কোণে কাছারি  বাড়ি।  পূর্ব  দিকে  দুটি  পুকুর।  রাজবাড়ি থেকে প্রায়  দু’শ  মিটার  দক্ষিণে  কুলিক  নদীর  তীরে  রাস্তার  পূর্ব  পার্শ্বে রামচন্দ্র  (জয়কালী)  মন্দির।  বর্তমানে  রাজ  বাড়ি  ও  মন্দিরের  অনেক  অংশই   নষ্ট  হয়ে গেছে।  ১৯৭১  সালে  পাক  সেনারা মন্দিরটির  ব্যাপক  ক্ষতি  সাধন  করে।

 

গোরক্ষনাথ  মন্দির:

রাণীশংকৈল  উপজেলার  নেকমরদ  থেকে ও প্রায় আট  কিলোমিটার  পশ্চিমে  গোরকই  গ্রাম।  নাথগুরু  গোরক্ষ  নাথের  নাম  অনুসারে  গ্রামটির  নাম  হয় গোরকই।  এ  গ্রামের  নাথ  আশ্রমে  পাঁচটি  মন্দির  ও  একটি ব্যতিক্রমধর্মী  অতি  প্রাচীন  কুপ  রয়েছে।   গোরকই  নাথ  আশ্রমের  মন্দির  পাঁচটি কয়েক  দফা  সংস্কার  করা  হয়েছে।  নাথ  মন্দিরের  সাথে  উত্তর  পাশে  গোরকই  কুপ  রয়েছে।  কুপটি  সমপূর্ণ  বেলে  পাথরে নির্মিত।  বাংলাদেশের  কোথাও  পাথরের নির্মিত  এ  ধরণের  কুপের  সন্ধান  পাওয়া  যায়  না।

 

খুনিয়াদিঘি  স্মৃতিসৌধ:

 প্রায় দুশ  বছর  আগে  স্থানীয়  কোন  জমিদার  খনন  করেছিল  খুনিয়া  দিঘি।  জনশ্রুতি  আছে  এ এলাকার  ব্যবসায়ীরা   দিঘির  পাশ  দিয়ে  ব্যবসা  করতে  রায়গঞ্জ  যেতেন।   দিঘির  এলাকাটি নির্জন  জঙ্গলাকীর্ণ  ছিল।  এখানে  এক  ব্যবসায়ীকে  খুন  করে  দিঘির  পাড়ে  ফেলে রেখেছিল।  তখন  থেকে  দিঘির  নাম  খুনিয়া দিঘি।  ১৯৭১  সালে  স্বাধীনতা  যুদ্ধের  সময়  হানাদার  পাক  বাহিনী বহু  বাঙালী  কে  হত্যা  করে  এ  দিঘিতে  ফেলে রাখে।  খুনিয়া  দিঘির  পাড়ে   স্বাধীনতা  স্মৃতিসৌধ  গড়ে  তোলা  হয়।

 

পীর নাছেরিয়া মাজার মসজিদঃ

রাণীশংকৈল উপজেলা হতে প্রায় দশ কিলোমিটার উত্তরে নেকমরদ স্থানটির মূল নাম ছিল ভবানন্দপুর। শেখ নাসির-উদ-দীন নামক এক পূন্যবান ব্যক্তি ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভবানন্দপুর আসেন। তিনিই পীর শাহ্‌ নেকমরদ নামে খ্যাতিমান এবং তার নাম অনুসারেই ভবানন্দপুর পরবর্তীকালে নেকমরদ নামে পরিচিতি লাভ করে। নেকমরদ বাজারের পূর্বদিকে পীর শেখ নাসির-উদ-দীন নেকমরদ মাজার। মাজারটি সম্পূর্ণ কাঁচা ছিল। মাজারের কারুকার্য খচিত চাদোয়া এবং জামে মসজিদটি প্রায় আশিবছর পূর্বে নির্মিত হয়।

 

জগদল রাজবাড়িঃ

রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পশ্চিমে জগদল নামক স্থানে নাগর ও তীরনই নদীর  মিলন স্থলে ছোট একটি রাজবাড়ি রয়েছে। রাজবাড়িটির সম্ভাব্য নির্মাণকাল উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ। বর্তমানে রাজবাড়িটি প্রায় ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে।

 

পাথর নির্মিত মসজিদ মহেষপুর :

রানীশংকৈল উপজেলার সদর থেকে ০৩ কি:মি: দূএর মীরডাঙ্গী বাজার থেকে ১.৫ মি: পূর্বে কাঁচা রাস্তার পার্শ্বে মসজিদটির অবস্থান। প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায় আলা উদ্দীন হোসেনশাহ্ এর আমলে সম্পূর্ণ পাথর দিয়ে মসজিদটি নির্মিত। মসজিদ থেকে সামনে পুকুরের ঘাট পর্যন্ত পাথর দিয়ে রাস্তা বাধানো।

 

গড়গ্রাম দূর্গ:

নেকমরদ বাজার থেকে ০১ কি:মি: উত্তরে ৫০০X ৩০০ মিটার বিশিষ্ট একটি অপেক্ষাকৃত দূর্গের ধ্বংসাবেশ দেখা যায়। দূর্গের বিশেষ স্বাতন্ত্র হলো, দূর্গের মধ্যে আরোও একটি ক্ষুদ্র দূর্গ। ধারণা করা হয়,প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রী থেকে সুরক্ষিত দূর্গে ধনভান্ডার সঞ্চিত থাকতো। বর্তমান সরকারী হাই স্কুলের বিল্ডিং খনন কালে (১৯৬৯) ব্রোঞ্জ মূর্তি পাওয়া যায়, যা দিনাজপুর মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। ১০ টি মূর্তি, বেলে প্রত্ন সামগ্রী প্রমাণ করে মূর্তিগুলো গুপ্তযুগ অথবা পালযুগের।

 

রাণীশংকৈল দূর্গ:

প্রাচীন কাইছা নদী ও কুলিক নদীর মিলন স্থলে এবং কুলিক নদীর পশ্চিম পার্শ্বে বর্তমানে বন্দরের মাঝখানে পাকা রাস্তার সম্পূর্ণ পশ্চিম অংশটি মাটির দূর্গটির বর্তমান অবস্থান। যার আয়তন ২.৪X ১ কি:। দূর্গের মধ্যে ইট, ঝামার সন্ধান পাওয়া যায়।

 

জলাশয়:

নলদিঘী, চামার দিঘী, শিবদিঘী, ছোট রাণী , বড় রাণী এ রকম অসংখ্য প্রাচীন মাটির দূর্গ, বিহার, মঠ, মন্দির, জলাশ প্রমাণ করে জনপদটি ঐতিহাসিক কালের সৃষ্টি। ইতিহাসের পাঠক মাত্রই জানেন দিনাজপুর নামের সুষ্টির পূর্বে বিখ্যাতকয়েকটি সরকারের বিভক্ত ছিল। উল্লেখ যোগ্য ঘোড়াঘাট সরকার, তাজপুর সরকার ও পূর্ণিয়া সরকার। আমাদের আলোচ্য জনপদটি ঘোড়াঘাট সরকারে পশ্চিম-উত্তর, তাজপুর সরকারের সর্ব উত্তর এবং পূর্ণিয়া সরকারের পূর্ব প্রান্তে। বহতা নাগর নদী পূর্ণিয়া সরকারের প্রান্ত টাঙ্গন নদী পর্যন্ত ঘোড়াঘাট সরকার এবং তাজপুর সরকারের রায়গঞ্জে নাগড়-কুলিক মিলিত হওয়ায়সরকারপরিচালনা করা সহজ করা সহজ ছিল। আমাদের জানা আছে প্রাচীন রাজধানী কোটি বর্ষ, বানগড় এবং প্রথম মুসলমান বঙ্গ বিজেতার প্রথম রাজধানী দেবকোট, বর্তমান রায়গঞ্জের একটি থানা গঙ্গারাপুর আমাদের জনপদ থেকে মাত্র ৬০ মি: দক্ষিনে অবস্থিত। সঙ্গত কারণে এ এলাকাটি ছিল উত্তর জনপদের জন্য একমাত্র সহজ এবং স্বল্প দৈর্ঘ্যের দুরত্ব এবং অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। সুরক্ষার জন্য এর চেয়ে সুবিধা কোথায় পাওয়া যাবে। সর্বশেষে পথ রেখায় প্রমাণ করে পথিক এসেছিল। নোঙ্গর পেতেছিল,বসতি গড়েছিল। তাই তো এত মন্দির এত মসজিদ নির্মিত হয়েছিল।

ছবি


সংযুক্তি